পলিথিন থেকে পেট্রোল-ডিজেল উৎপাদন করছে মেহেরপুরের টুটুল

সফলতার গল্প

 পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদানের অন্যতম একটি পলিথিন। কিন্তু পলিথিন এখন আর ক্ষতিকর বর্জ্য নয়। সঠিক ব্যবহারে এটি যে আশীর্বাদ হতে পারে, বর্জ্য পলিথিন দিয়ে পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদন করে তাই দেখিয়ে দিলেন মেহেরপুরের কাঠ মিস্ত্রি জসিম উদ্দিন টুটুল।

মেহেরপুরের গাংনী উপজেলার রাজারপাড়া হেমায়েতপুর গ্রামের টুটুল পলিথিন থেকে পেট্রোল ও ডিজেল উৎপাদন করতে প্রযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করছেন টিনের তৈরি ড্রাম, কয়েকটি বোতল, কাঠ এবং প্লাস্টিকের বয়েম দিয়ে তৈরি রিফাইনার মেশিন।

এই প্রযুক্তিতে ড্রামের ভেতর পলিথিন রেখে তা আগুনের তাপে গলিয়ে বাষ্পের মাধ্যমে ডিজেল ও পেট্রোল উৎপাদন করছেন তিনি। এক লিটার ডিজেল উৎপাদন করতে তার খরচ হচ্ছে ১৫ টাকা, আর পেট্রোলে ২০ টাকা। তার উৎপাদিত  পেট্রোল ৭৫ টাকা ও ডিজেল বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা লিটার হিসেবে। উৎপাদিত পেট্রোল দিয়ে চলছে মোটর বাইক, ডিজেল দিয়ে চলছে কৃষিতে ব্যবহৃত পাওয়ার টিলার।

জসিম উদ্দীনের এই উদ্ভাবনে একদিকে যেমন পলিথিন রিসাইকেল হয়ে সম্পদে পরিণত হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পাচ্ছে৷ অপেক্ষাকৃত কম দামে পেট্রোল ও ডিজেল পেয়ে ব্যবহার করছেন এলাকাবাসীও। উৎপাদিত পেট্রোল দিয়ে মোটরবাইক এবং ডিজেল দিয়ে পাওয়ার টিলার চালিয়ে ইতোমধ্যে সফলতা পেয়েছেন তারা। আর সরকারি সহযোগিতা পেলে কম মূল্যে জ্বালানী উৎপাদন ও সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব বলে মনে করেন উদ্যোক্তা জসিম উদ্দীন।তিনি বাংলানিউজকে বলেন, আমি প্রতিদিন প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে গাংনী উপজেলা শহরে মিস্ত্রির কাজ করতে যেতাম। এ সময় ভ্যান বা ট্যাম্পুতে কর্মস্থলে যাওয়ায় আমার সহকর্মীরা আমাকে মোটরসাইকেল কেনার জন্য বলতো। আমি তাদের বলেছিলাম, যেদিন পেট্রোল উৎপাদন করতে পারবো সেদিন মোটরসাইকেল কিনবো। 

এটা নিয়ে তারা হেয়ালি করতো। সেই হেয়ালিপনা থেকেই তেল উৎপাদনের কথা চিন্তা করি। তারপর সেই ভাবনা থেকে ডিজেল ও ডিজেলকে আরও রিফাইন করে পেট্রোল তৈরি করি।

জসিম উদ্দিন টুটুল বলেন, এক কেজি পলিথিন থেকে প্রায় ৭৫০ গ্রাম জ্বালানি উৎপাদন হচ্ছে। এর মধ্যে ৩০০ গ্রাম পেট্রোল আর ৪৫০ গ্রাম ডিজেল। এটি অত্যন্ত পরিশোধিত জ্বালানি। সরকার যদি প্রতিটি জেলায় তেল পরিশোধন মেশিন দিয়ে সহায়তা করে তাহলে আমার মত অনেক যুবকই এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বাবলম্বী হতে পারবে।

এদিকে বর্জ্য থেকে জ্বালানী উৎপাদনের খবর সাড়া ফেলেছে স্থানীয়দের মধ্যে। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থান থেকে মানুষ তেল উৎপাদন যজ্ঞ দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন টুটুলের বাড়িতে। শাহজামাল ইসলাম নামের স্থানীয় একজন জানান, টুটুলের উৎপাদিত পেট্রোল তিনি নিয়মিত ব্যবহার করছেন। এখানে এটা তিনি ৭৫ টাকা লিটার হিসেবে পাচ্ছেন এবং মোটরসাইকেলে তা স্বাভাবিকভাবেই কাজ করছে। মোটরসাইকেলের ইঞ্জিন মেকার দিয়ে দেখানো হলে তিনি জানিয়েছেন, পেট্রোলটা অত্যন্ত পাতলা, ইঞ্জিনে কোন সমস্যা নেই।

স্থানীয় কৃষক আব্দুর রহমান বলেন, মাঠে সেচের জন্য ডিজেল চালিত পাম্পে নতুন উৎপাদিত ডিজেল ব্যবহার করছি। আমার মতো অনেক কৃষকই এখন এই ডিজেল ব্যবহার করছেন। এটি দামে সাশ্রয়ী ও মানেও ভালো। তাই এলাকার কৃষকের কাছে এই ডিজেলের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

গাংনী মহিলা ডিগ্রী কলেজ উপাধ্যক্ষ মো. নাসির উদ্দীন এ বিষয়ে বাংলানিউজকে বলেন, পলিথিনের এ ধরনের পুনর্ব্যবহারই পারে পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনতে। এটি একটি বিস্ময়কর প্রযুক্তি। এ ব্যাপারে সরকারের উচিত তার পাশে দাঁড়ানো। এ প্রযুক্তির সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন ঘটিয়ে খুব সহজেই পলিথিন বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং তা থেকে তেল উৎপাদনের মাধ্যমে জ্বালানির চাহিদা মেটানো সম্ভব