আপনি যখন প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন তখনো কি ন্যায় বিচার করেছেন ??

আলোচিত সংবাদ, ফেইসবুক থেকে

সুরেন্দ্র কুমারকে বাংলাদেশের খ্যাতিমান ও নির্বাসিত সাংবাদিক ওলিউল্লাহ নোমানের খোলা চিঠি:

দেশ ছাড়ার পরের দিন বাবু সরেন্দ্র কুমারকে একবার খোলা চিঠি লিখেছিলাম। আপনারা যারা পড়েছিলেন, সেটা মনে থাকার কথা। আজও আবার একটা খোলা চিঠি লেখা প্রয়োজন অনুভব করছি। তাই বিয়ানে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা সেরেই লিখতে বসে গেলাম।

গতকাল পত্রিকায় দেখলাম, তিনি বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতি থাকতেই ন্যায় বিচার পাইনি। এখন কিভাবে আশা করি! তিনি এও বলেছেন, বাংলাদেশে ন্যায় বিচার আশা করা যায় না!’ তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের হওয়ার পর ‘বেনার নিউজের’ ওয়াশিংটন প্রতিনিধিকে তিনি এসব কথা বলেছেন। দুর্নীতি মামলার পর প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলেন, বেনার নিউজের সাংবাদিক রনি টলডেন্স। তাঁকে তিনি এসব কথা বলেন।

এখন আসি আমার কথায়। বাবু সুরেন্দ্র কুমার আপনাকে চিনতাম উকিল অবস্থা থেকে। সিলেটে কাষ্টঘরের উকিল হিসাবে আপনি পরিচিত ছিলেন। কোথায় পড়াশোনা করেছেন সেটাও জানি। সেই বিষয় নিয়ে আজ আপনাকে কিছু বলব না। আপনাকে ধন্যবাদ দিতে চাই, সত্য বলার জন্য। আপনি বলেছেন, বাংলাদেশে এখন ন্যায় বিচার আশা করা যায় না। বাবু আপনার কাছে সবিনয়ে আমার প্রশ্ন হল, আপনি যখন হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের বিচারক ছিলেন তখন কি ন্যায় বিচার ছিল? আপনি যখন প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন তখনো কি ন্যায় বিচার করেছেন? তখনো কি মানুষ আপনার কাছে ন্যায় বিচার আশা করতে পেরেছিল?

বাবু, আপনি হয়ত: কইবেন, এ আবার কেমন কথা! আনপর কিতাব দিয়েই শুরু করছি।

বাবু আপনার লেখা কিতাব ‘এ ব্রোকেন ড্রিম’। ওখানে আপনি নিজেই লিখেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রক্রিয়ার কথা। ওই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত থাকার কথা আপনি অকপটে স্বীকারও করেছেন কিতাবে। আপনি ওই কিতাবে লিখেছেন, শেখ হাসিনার সাথে আপনার সখ্যতার প্রসঙ্গে। সখীর সাথে মিলে আপনারা কতিপয় রাজনৈতিক নেতার ফাঁসির আয়োজন করেছিলেন। সখির সাথে মিলে মিশে ফাঁসির আয়োজন করাটা ন্যায় বিচারের কোন স্থরে পড়ে এটা কি একটু বলবেন!

বাবু, আপনার কি মনে পড়ে, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিমকে বলেছিলেন, ৩টা রায় দিয়া লন। আপনাকে এখানে (আপিল বিভাগে) নিয়া আসি! এসব কি ন্যায় বিচারের বানী ছিল তখন!

বাবু, সব মামলা বিষয়ে বলতে যাবো না। চিঠি অনেক লম্বা হয়ে যাবে। পাঠ করতে ধৈর্য্যহারা করতে চাই না আপনাকে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর মামলায় আসি। তাঁর দাবী ছিল মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি পাকিস্তান চলে গিয়েছিলেন। সেখানে লাহোরে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটিতে মাষ্টার্স করেছেন তখন। মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময়টা তিনি কাটিয়েছেন পাকিস্তানের লাহোরে।এই দাবীর স্বপক্ষে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পক্ষ থেকে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান চিঠি দিয়ে সত্যতা স্বীকার করেছেন। চিঠির পাশাপাশি তিনি ভিডিও বার্তা দিয়ে বলেছেন, কোন তথ্য যাছাই বাছাই করতে হলে পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটি সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত রয়েছে। সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী পাঞ্জাব ইউনিভার্সিটির একটি দ্বিনকল সনদও (মূল কপি হারিয়ে গেলে দ্বিনকল সনদ দেয়া হয়) দাখিল করেছিলেন। এই সনদে উইনিভার্সিটির ভিসি, রেজিষ্ট্রার এবং ডিপার্টমেন্ট প্রধান স্বাক্ষরের মাধ্যমে সত্যায়িত করা ছিল। এ সনদ সম্পর্কে আপনি কি বলেছিলেন সেটা কি মনে আছে বাবু আপনার? এই সনদ যাছাই বাছাই ছাড়াই আপনি একটি মানুষকে খুনের আয়োজন করে দিলেন? যাছাই বাছাই না কররে একটা মানুষকে খুনের হুকুম দেয়াটা কি ন্যায় বিচারের অংশ! এটা কি ন্যায় বিচার ছিল বাবু? এটা কি বলার সুযোগ আছে, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর বিষয়টি সন্দেহের উর্ধ্বে উঠে আপনারা রায় দিয়েছেন?

বাবু আরেকখান কথা বলতে চাই। আপনাদের হাইকোর্টের বিচারপতি শামিম হাসনাইন তখন পাকিস্তানের একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন। তিনি নিজে স্ব উদ্যোগে চিঠি দিয়ে স্বাক্ষ্য দেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। একজন সহকর্মী বিচারপতির আবেদন আপনারা গ্রহন করলেন না। শামিম হাসনাইনের মা এবং পকিস্তানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী যাদের বাড়িতে ছিলেন, যারা তাঁকে এয়ারপোর্টে গ্রহন করতে এসেছিলেন তারা স্বাক্ষ্য দেয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। বাবু, আপনারা সেই স্বাক্ষ্য গ্রহন না করে একজন মানুষকে এক তরফা সরকারি বাণী শুনে খুনের হুকুম দিলেন! এটা কি ন্যায় বিচার বলা যায়! বাবু আপনি কি ন্যায় বিচার করেছিলেন তখন? সার্টিফিকেট যাছাই-বাছাই করে, তাদের স্বাক্ষ্য গ্রহনের পর খুনের হুকুম দিতে অসুবিধা ছিল কোথায়। নাকি এসব যাছাই-বাছাই করতে গেলে খুনের হুকুম দেয়াটা একটু সমস্যা হত! তাই না!

বাবু, এবার আসি আবদুল কাদের মোল্লার মামলায়। তাঁর পক্ষে প্রত্যক্ষদর্শী স্বাক্ষী হিসাবে সরকার হাজির করেছিল মোমেনা বেগমকে। এই মোমেনা বেগম ৩ জায়গায় একই ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন ৩ রকমে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরকে বলেছেন, ঘটনার সময় তিনি শশুড়বাড়িতে ছিলেন। পরবর্তীতে মানুষের কাছে শুনেছেন। দ্বিতীয় তিনি বলেছেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত কর্মকর্তার কাছে। এখানে তিনি বলেছেন, তাঁর বয়ষ ১২-১৩ ছিল। ঘটনার সময় ছোটবোনকে নিয়ে খাটের নিচে ট্রাঙ্কের পেছনে লুকিয়ে ছিলেন। তবে আবদুল কাদের মোল্লাকে দেখেছেন এমন কথা বলেননি। বলেছেন মানুষের কাছে শুনেছেন তিনি। তৃতীয়বার তাঁকে দিয়ে বলানো হয়েছে ট্রাইব্যুনলের ক্যামেরা ট্রায়ালে। প্রশ্ন হচ্ছে, খাটের নিচে ট্রাঙ্কের পেছনে লুকিয়ে থাকা ১২-১৩ বছরের একজন কিশোরী ৪০ বছর আগে দেখা চেহারা কিভাবে চিহ্নিত করলেন। ট্রাঙ্কের পেছনে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তি কিভাবে দেখলেন! এর মধ্যে কোন বক্তব্যটি তিনি সত্য? মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরকে দেয়া বক্তব্য? তদন্ত কর্মকর্তাকে দেয়া বক্তব্য ? নাকি ট্রাইব্যুনালে স্বাক্ষ্য দেয়ার সময় দেয়া বক্তব্য? এক ব্যক্তির একই ঘটনায় ৩টি বক্তব্য থেকে একটাকে সত্য হিসাবে ধরে নেয়ার বিচারিক মাফকাটি কি ছিল? এটা কিভাবে আপনারা চিহ্নিত করে সন্দেহের উর্ধ্বে উঠলেন! এই মোমেনার বিতর্কিত বক্তব্যের স্বাক্ষ্য থেকে আপনারা একজন মানুষ খুনের হুকুম দিলেন! এটা কি ন্যায় বিচার হয়েছিল বাবু????

বাবু, আপনার কাছে সবিনয়ে জানতে চাই, তত্ত্ববাধায়ক সরকার বাতিল প্রসঙ্গে। খায়রুল হক, মোজাম্মেল হোসেন, সুরেন্দ্র কুমার এবং সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। আপনারা ৪জন মিলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে রায় দিলেন। বাকী ৩ জন দিলেন বিপক্ষে। ৭জন মিলে বিভক্ত রায়ে ওপেন আদালতে ঘোষণা করা হল, পরবর্তী ২ মেয়াদের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার থাকতে পারে। অবসরে যাওয়ার ১৪ মাস পর খায়রুল হক সেই রায় লিখলেন। কিন্তু পরবর্তী ২ মেয়াদের বিষয়টি মূল রায়ে আর রাখা হল না। প্রকাশ্য আদালতে ঘোষিত রায় পরিবর্তন করা কি ন্যায় বিচারের অংশ ছিল, বাবু!? আপনি ত সে রায়ে স্বাক্ষর করেছেন!

বাবু আপনার কাছে আরো জানতে চাই একটি প্রসঙ্গে। আপনি প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর হুকুম জারি করলেন, অবসরে গিয়ে রায় লেখা অবৈধ! আপনার সেই লিখিত হুকুম এখনে কাগজে ভাসছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের রায় তো খায়রুল হক অবসরে যাওয়ার ১৪ মাস পর লিখেছিলেন। সেটাতে স্বাক্ষর করে কি আপনি অবৈধ কাজ করেননি তাইলে?

বাবু সরেন্দ্র কুমার, দেশে ভোটার বিহীন নির্বাচন, ভোটের আগের রাতে ব্যালটে সীলমারার সুযোগটা কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের মাধ্যমে করে দেয়া হয়েছে। আপনারা ৪জন মিলে আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে সার্বিক সহযোগিতা করেছেন বলেই ত এ গুলো সম্ভব হচ্ছে এখন! তাই না!

বাবু, আপনার কি মনে আছে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুলের শুনানী কথা। আপনি তখন ৬ বিচারপতির বেঞ্চে কনিষ্ঠতম বিচারক ছিলেন। কিন্তু আপনার লাফালাফি দেখে মনে হয়েছিল আপনি প্রধান বিচারপতির পদে বসে আছেন। আমরা নিউজের স্বপক্ষে আদালতে ডকুমন্টেস হাজির করেছিলাম। আপনারা তখন বলেছিলেন ‘এখানে ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’! ‘সত্য মিথ্যা যাছাইয়ের জন্য আমরা এখানে বসিনি’। অতি দম্ভের সাথে আপনারা এ কথা গুলো বলেছিলেন সেদিন! বাবু এ গুলো কি তখন ন্যায় বিচারের কথা ছিল?!!!

বিচারের নামে আজ প্রহসনের যে খেলা চলছে, সেই পথ তৈরি করতে একজন সিপাহসালার হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন আপনি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। সেই দিন গুলোর কথা একবার ষ্মরণ করেন প্লিজ। চোখ বন্ধ করে একবার ভাবুন। আপনারা বিচারের নামে কি করেছেন! সরকার ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠতে আপনার সহযোগিতা কতটা সহায়ক ভুমিকা রেখেছে, সেটা একবার ভাবুন। সেই আবেদন রেখে আজকের মত খোলা চিঠি এখানেই শেষ করছি।

Oliullah Noman