বিবাহিত বয়স্ক ব্যবসায়ীদের নিয়ে ছাত্রলীগের কমিটি

রাজনীতি

বিবাহিত বয়স্ক ব্যবসায়ীদের নিয়ে ছাত্রলীগের কমিটি

প্রায় দশ মাস প্রতীক্ষার পর অবশেষে গতকাল সোমবার ঘোষণা করা হয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি। যদিও ৩০১ সদস্যের এই কমিটি নিয়ে উঠেছে বিস্তর অভিযোগ। এই কমিটি ঘোষণার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন পদবঞ্চিত ও অবমূল্যায়িতরা। ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে কমিটি থেকে পদত্যাগের দাবি করেছেন এক উপসম্পাদক। পদবঞ্চিত ও প্রত্যাশিতরা পদ না পেয়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করেছেন।

এ সময় ছাত্রলীগের নারী নেত্রীদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন বলে জানা গেছে। ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সভাপতি রয়েছেন রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন। সহসভাপতি পদে রয়েছেন ৬১ জন। সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন গোলাম রাব্বানি। যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন ১১ জন। এ ছাড়া সাংগঠনিক সম্পাদক পদে রয়েছেন ১১ জন।

ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন আল-আমীন সিদ্দিক সুজন। তার সঙ্গে উপ-ক্রীড়া সম্পাদক পদে রয়েছেন আরও তিনজন। বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পদক করা হয়েছে সাদুন মোস্তফাকে। উপ-বিজ্ঞানবিষয়ক সম্পাদক রয়েছেন আরও ৪জন। আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাকিনুল হক চৌধুরীর সঙ্গে উপসম্পাদক হিসেবে রয়েছেন আরও ৫ জন। পাঠাগার সম্পাদক হয়েছেন জাভেদ হোসেন। সঙ্গে উপসম্পাদক হিসেবে রয়েছেন ৫ জন। তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক পল্লব কুমার বর্মণের সঙ্গে উপসম্পাদক হয়েছেন আরও ৩ জন।

তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন শাকিল আহমেদ জুয়েল। তার সঙ্গে উপসম্পাদক রয়েছেন ৫ জন। ধর্মবিষয়ক সম্পাদক তাজউদ্দিন। তার সঙ্গে রয়েছেন আরও ৪ উপসম্পাদক। গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক হয়েছেন আবদুল্লাহিল বারী। তার সঙ্গে উপসম্পাদক রয়েছেন ৩ জন। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হয়েছেন ইমরান জমাদ্দার। তার সঙ্গে উপসম্পাদক রয়েছেন ৪ জন। স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাবিষয়ক সম্পাদক শাহরিয়ার ফেরদৌস হিমেলের সঙ্গে উপসম্পাদক রয়েছেন ৪ জন। সাহিত্যবিষয়ক সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন আসিফ তালুকদার। তার সঙ্গে রয়েছেন ৩ উপসম্পাদক।

ঘোষিত কমিটি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এতে প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদারি ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বয়স্ক, বিভিন্ন মামলার আসামিরাও রয়েছেন। পদ দেওয়ার ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতিরও অভিযোগ উঠেছে। কমিটিতে সহসভাপতি পদ পেয়েছেন সাদিক খান। তার স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলে এর প্রতিবাদে রাজু ভাস্কর্যের সামনে মানববন্ধন হয়েছিল।

অভিযোগ উঠেছে-দীর্ঘদিন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় থাকলেও ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকের আত্মীয় হওয়ার সুবাদে সাদিক খান পদ পেয়েছেন। এ ছাড়া সহসভাপতি সোহানী তিথিও বিবাহিত। উপসম্পাদক রুশি চৌধুরী, আঞ্জুমান আরা অনু, আফরিন লাবনীসহ বেশ কয়েকজন বিবাহিত রয়েছেন কমিটিতে। ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আছেন সহসভাপতি তানজিল ভূঁইয়া তানভীর। তার বয়সও ত্রিশের ঊর্ধ্বে। অভিযোগ আছে-ছাত্রলীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর কোটায় তানভীর পদ পেয়েছেন।

এ ছাড়া বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে আল নাহিয়ান খান জয় ও তৌফিকুল হাসান সাগরের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগ সভাপতির আপন ভাই আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক রাকিনুল হক চৌধুরী। তিনি এর আগে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রলীগে সক্রিয় ছিলেন। সহসভাপতি আতিকুর রহমান খানের বিরুদ্ধে মারামারিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের প্রায় সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সহসভাপতি পদ পাওয়া জহিরুল ইসলাম জহিরের। পরীক্ষায় নকলের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন সহ-সভাপতি প্রদীপ চৌধুরী। সাংগঠনিক সম্পাদক শাকিল ভূঁইয়ার পরিবারের সব সদস্যই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। সৃজন ভূঁইয়া সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা।

অভিযোগ আছে-সভাপতির বন্ধু হিসেবে পদ পেয়েছেন তিনি। আবার দপ্তর সম্পাদক আহসান হাবিব এবারই প্রথম কোনো পদ পেয়েছেন। এদিকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অনেক ত্যাগী নেতাকে, যারা এর আগে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও গত দুটি জাতীয় নির্বাচনে ভূমিকা রেখেছিলেন। এ ছাড়া অনেককে যোগ্যতা অনুসারে পদ দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ উঠেছে। অযোগ্য, অছাত্র, বিবাহিত, বিভিন্ন মামলার আসমিদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদায়নের প্রতিবাদে গতকাল বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রলীগের একাংশ। সেই মিছিলে হামলার অভিযোগ উঠেছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। গতকাল সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বিক্ষোভ মিছিল করার প্রস্তুতিকালে ঢাবির মল চত্বরে জড়ো হওয়ার পর ছাত্রলীগ নেত্রী তিলোত্তমা শিকদার, বিএম লিপি এবং শ্রাবণী শায়লার ওপর হামলা করেন সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুসারীরা। পরে রাত ৮টার দিকে মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করতে গেলে দ্বিতীয় দফা হামলার শিকার হন তারা। এতে তিলোত্তমা সিকদার, বিএম লিপি, জিয়াসমিন শান্তা, শ্রাবণী শায়লা, শ্রাবণী দিশাসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। এ সময় তাদের চিকিৎসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টার ও ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হয়। তিলোত্তমা শিকদার দাবি করেন, নতুন কমিটির সহসভাপতি সাদিক খান তার ওপর হামলা করেছেন। সাবেক প্রচার সম্পাদক সাইফ বাবু বলেন, অছাত্র, বিবাহিত এবং বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্তদের নিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমরা এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গেলে শোভন-রাব্বানীর অনুসারীরা আমাদের বোনদের ওপর হামলা করেন।